র্যাগিং ইজ নট এ জোক! ইটস এ ক্রাইম
মো. আশরাফুল আলম
র্যাগিং কি ?
দৈহিক/মানসিক পীড়ন, যেকোনো
ধরনের অশোভন আচরণ, যেমন
হুমকি, অবজ্ঞাসূচক উক্তি, গালাগাল, তিরস্কার,
অশালীন অঙ্গভঙ্গি ইত্যাদি, কারো অধিকারে হস্তক্ষেপ/কর্তব্যকর্ম থেকে বিরত রাখার
চেষ্টা/মতপ্রকাশে বাধাদান, কারো সামাজিক/মানবিক
মর্যাদাহানিকর কর্মকান্ডই র্যাগিং নামে
পরিচিত।
একটি গল্প মনে হয়
আমরা সবারই জানি।
একদল ছেলে পুকুরে একটি
ব্যাঙকে লক্ষ করে ঢিল
ছুড়তে থাকে এবং এতে
তারা প্রচন্ড মজা পায়।
কিন্তু ব্যাঙের জন্য জন্য এই
ঘটনা মোটেই মজাদায়ক ছিল
না। যারা র্যাগ দিচ্ছেন তারা
জেনেশুনে কিংবা অজান্তে মজা
নিলেওর্যাগ খাওয়া
ছেলে বা মেয়েটার অবস্থাটা
ঢিল খাওয়া ব্যাঙের মতই
হয়।
র্যাগিং এখন আর
মজার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে
না, হয়ে যায় শারীরিক
বা মানসিক নির্যাতন। র্যাগিংএকটি জঘন্য
সামাজিক ব্যাধি, র্যাগিং কোনো
মজা নয়, এটা একটা
সন্ত্রাস। এটি
একটি অপরাধ।
র্যাগিং এর উৎপত্তি
সপ্তম ও অষ্ঠম শতকের
দিকে খেলার মাঠে টিম
স্পিরিট নিয়ে আসার জন্য র্যাগিং বা স্ল্যাজিং
এর প্রথম শুরুটা হয়েছিল
গ্রিক কালচারে। কিন্তু
কালের বিবর্তনে পশ্চিমা ইউনিভার্সিটিগুলোতে এটা ঢুকে যায়
অষ্টদশ শতাব্দীতে। যার
ব্যবহারটা বেশি হয় ইউরোপিয়ান
দেশগুলোতে। ১৮২৮
থেকে ১৮৪৫ সালের দিকে
আমেরিকার বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে এর প্রচলন ঘটে
বিভিন্ন ছাত্র সংস্থা পাই,
আলফা, বিটা, গামা, কাপ্পা
ও অন্যান্য ছাত্র সংস্থার উদ্ভবের
মাধ্যমে।
এগুলোতে সদস্যদের সাহসের পরিচয় নিতে র্যাগিং (পশ্চিমে এটাকে বলে হ্যাজিং)
এর প্রচলন ঘটে।
আমাদের উপমহাদেশে ইংরেজদের মাধ্যমে এই অপসংস্কৃতি অনুপ্রবেশ
করে এবং এর বিবর্তিত
রূপটা রয়ে যায়।
বিশেষ করে র্যাগিং
এর খারাপ প্রভাব সবচেয়ে
ভয়ংকর বর্তমানে ভারতে। যেসব
দেশে র্যাগিং এর
উদ্ভব হয়েছে, তারা সময়ের
সাথে সাথে ঠিকই এর
প্রভাব মুক্ত হয়েছে আর
আমাদের উপমহাদেশে আরো ভয়ংকর রূপ
নিয়েছে।
ইতিহাস ঘাটলে এমনটাই দেখা
যায়, আমরা বাজে সংস্কৃতিটাকে
লালন পালন করছি কিন্তু
যারা এর সূচনা করেছে
তারা অনেক আগেই ছুড়ে
ফেলেছে। আমাদেরও
সময় এসেছে ছুড়ে ফেলে
দেয়ার।
আমাদের দেশে ক্যাম্পাসে র্যাগ দেওয়ার রেওয়াজটা
কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম চালু হয়েছিল
তার সঠিক তথ্য পাওয়া
যায়নি। অনেকেই
বলেন জাহাঙ্গীরনগরে আবার অনেকেই বলেন
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে র্যাগদেওয়া হয়
সাধারনত ১ম বর্ষে ভর্তিকৃত
শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু হওয়ার
ঠিক পরপরই।
র্যাগিং এর কারনসমূহ
অনুসন্ধান করলে পাওয়া যায়
* অবচেতন মনে নতুন শিক্ষার্থীদেরকে
নিজেদের প্রতিদ্বদ্বী মনে করা।
* যৌন হয়রানীর মাধ্যমে যৌন তৃপ্তি লাভ।
* নিজের জীবনের কিছু অতৃপ্ত
কামনা বাসনা, মানসিক ও
শারীরিক অতৃপ্তির বহি:প্রকাশ।
* নতুন ছাত্র-ছাত্রীদের নিজেদের
সন্ত্রাসী কাজে চাকর হিসেবে
পোষ মানিয়ে নেয়া।
* সিনিয়রদের দ্বারা পূর্ব র্যাগিং এর প্রতিশোধ।
* জোরপূর্বক ভবিষ্যৎ অনৈতিক কাজে সাহায্যকারী
হিসেবে ব্যবহার।
র্যাগিং এর ফলাফল
র্যাগিং এর ফলাফল
সম্পর্কে আমরা কম বেশি
সকলেই অবগত আছি।
বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের
যে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং এর ঘটনা
ঘটেছে যার মধ্যে অন্যতম
ছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। র্যাগিং এর ফলে
দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য
হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়তে, অনেকে মানসিক
বুদ্ধি প্রতিবন্দি হয়েছে, অনেকে আবার
মান-সম্মান রক্ষার জন্য
ঘটনা চেপে গিয়েছে।
আমরা অনেকেই হয়ত বলিউডের
“টেবিল নম্বর ২১” সিনেমাটা দেখেছেন। র্যাগিং এর ফলে
একটি সুন্দর, সুস্থ্য ও স্বাভাবিক ছেলে
কিভাবে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতে রূপান্তরিত
হয় তা অনেক ভালোভাবে
ফুটে উঠেছে সিনেমাটিতে।
র্যাগিং বন্ধে করণীয়
নতুন ভাই বোনদের স্বাগত
জানানোর পাশাপাশি তারা যেন র্যাগিং নামক এই
মানসিক ও শারিরীক নির্যাতনের
শিকার না হয় সেদিকে
খেয়াল রাখা ও ব্যবস্থা
নিতে হবে। সামজিক
আন্দোলনগুলো স্বল্প পরিসরে শুরু
করলেও ধীরে ধীরে তা
গন জোয়ারে রূপ নেয়। র্যাগিং বন্ধ করতে
হল/ভার্সিটি কর্তৃপক্ষের উচিত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাও
নেওয়া। সর্বোপরি, র্যাগিং এর কুফল
সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করতে
হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং বন্ধের
ব্যবস্থা গৃহীত হলেও দীর্ঘ
বিরতির পর পুনরায় বাংলাদেশ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) গত বছর থেকে
শুরু হয়েছে র্যাগিং
এর প্রচলন যা এবছর
আরও ব্যাপকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তাই বাকৃবিসহ বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়রদের
বলছি.........
ভয় দেখিয়ে হয়ত সামনা-সামনি সালাম পাওয়া
যায় কিন্তু মন থেকে
সম্মান পাওয়া যায় না। যাদেরকে
ভয় দেখানো হয় তারা
শুধু সামনেই ভয় পায়
কিন্তু পিছনে পিছনে গালি
দেয়। হয়তবা
আপনাদেরকেও অনেক সিনিয়ররা র্যাগ দিয়েছিল।
কিন্তু তখন কি তাদের
সম্মান দিয়েছিলেন নাকি র্যাগ
খাওয়ার পর মনে মনে
গালি দিয়েছিলেন ? প্রশ্নর উত্তরটা আপনারাই দিবেন।
Comments